গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২২ এ ১০:২৮ PM
কন্টেন্ট: পাতা
ভ্যাট গোয়েন্দার সাম্প্রতিক কার্যক্রমের একটা সালতামামির প্রয়োজনীয়তা অনুভ‚ত হয়েছে। এই তাগিদটা ভেতর থেকেই এসেছে। এই সংস্থার সাথে যারা সংশ্লিষ্ট তাদের অনেকে এমনটা প্রত্যাশাও করেন। বিশেষ করে ২০১২ নতুন ভ্যাট আইন ১লা জুলাই ২০১৯ সাল থেকে কার্যকর হওয়ার পর ভ্যাট গোয়েন্দার কার্যক্রম নিয়ে একটা মূল্যায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। এই নিবন্ধে সাম্প্রতিক এসব কার্যক্রম নিয়ে সার্বিক একটা পর্যালোচনা তুলে ধরা হবে।
ভ্যাট গোয়েন্দার মূল কাজ তিনটি- গোয়েন্দা, তদন্ত ও নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা। এই তিন কাজের সমন্বয় করে ভ্যাট সংক্রান্ত বিধি-বিধানের পরিপালনে কোথাও কোনো ঘাটতি থাকলে তা বের করা ও আইনে বর্ণিত পদ্ধতিতে তা নিষ্পত্তি করাই এই সংস্থার অন্যতম দৃষ্টি। এসব কাজের মূলে রয়েছে অবিরত নজরদারি। ভ্যাট গোয়েন্দার কাছে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য রয়েছে প্রত্যেক নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের। তাদের ব্যবসার ধরন ও কলেবর বুঝে ব্যবস্থার কথা ভাবা হয়। আবার কোনো গোয়েন্দা তথ্য পেলেই তার পেছনে ছুটতে হবে- তেমনটি নয়। কেন এই তথ্যটা গুরুত্বপূর্ণ এবং এই সংক্রান্তে কোনো অভিযান করলে এর ফলাফল ঐ সেক্সরে বা অঞ্চলে বা সাবার জন্য দৃষ্টান্তমূলক হবে কি-না তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়। প্রত্যেকটি কাজের পেছনে একটি নির্দিষ্ট যুক্তি ও অভিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
ভ্যাট ফাঁকির প্রবণতা নতুন নয়। ব্যবসার সাথে লাভের সম্পর্ক, আর ভ্যাট না দিলে ব্যবসার মুনাফা স্ফীত হয়-এটি ফাঁকির পেছনে অন্যতম প্রণোদনা হিসেবে দেখা হয়। তবে সকল ভ্যাট ফাঁকি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে হানা দেয়া যথাযথ নয়; তা বাস্তবসম্মতও নয়। ভ্যাট গোয়েন্দার কার্যক্রমে এই চিন্তাটি সর্বদা কাজ করে। সংস্থার কাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নিবারকমূলক। একজনকে আইনের আওতায় শাস্তি দিয়ে অন্যদের শিক্ষা দেয়াই হচ্ছে অন্যতম উদ্দেশ্য; ফাঁকির ক্ষেত্রে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। অন্যরা এতে সতর্ক হয় এবং আইন মেনে চলার ক্ষেত্রে তারা আরো যতœবান হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আওতায় ১২টি ভ্যাট কমিশনারেট রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ৪টি ও ঢাকার বাইরে আরো ৫টি অঞ্চলে বিভক্ত। বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) দেশের বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক; এটি অঞ্চল দ্বারা নির্দিষ্টকৃত নয়। ভ্যাট কমিশনারেটগুলো ভ্যাটদাতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিদিন, সপ্তাহ, মাস ও বছরের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যবসার কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করে থাকে। রেজিস্ট্রেশন, রিটার্ন, রিফান্ড, সহগ, ট্রেজারি জমা ইত্যাদির হিসাব স্থানীয় পর্যায়ের কমিশনারেট গুলোতে সম্পন্ন করা হয়। আঞ্চলিক কমিশনারেট আবার এসব প্রতিষ্ঠানে নিবারক ও অডিটও করে থাকে। মোদ্দাকথা, ভ্যাট এর সামগ্রিক কার্যক্রম এসব কমিশনারেট থেকে পরিচালিত হয়।
তবে ফাংশনাল এসব কার্যক্রমে ভ্যাটদাতা প্রতিষ্ঠানকে অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর অর্থে মনিটরিং করা সম্ভবপর হয়ে উঠে না। এর মূল কারণ হলো, আইন অনুসারে ব্যবসায়ী নিজেই একজন স্বীকৃত ভ্যাট সংগ্রাহক। তিনি এনবিআরের পক্ষে এই দায়িত্বটা পালন করেন। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, ঐ ব্যবসায়ী এই দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করে না বা ক্রেতাদের নিকট তেকে ভ্যাট সংগ্রহ করলেও তা সরকারি কোষাগারে জমা করে না; ক্রেতা দিলেও তা সরকার পাচ্ছে না। এটি তখন জনগণের টাকা ‘আত্মসাৎ’ এর পর্যায়ে পড়ে। এই ধরনের কোন অভিযোগ আসলে তখন ভ্যাট কর্তৃপক্ষের জন্য তা আইন অনুসারে অনুসন্ধান বা তদন্ত করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। এসব ফাঁকি আবার অনেকটা সূ² হয়; নানা ধরনের কৌশল ও পন্থা অবলম্বনে হয়ে থাকে। এসব অনেক সময় আঞ্চলিক কমিশনারেট গুলোর নজরদারি এড়িয়ে যায়। ভ্যাট গোয়েন্দা নজরদারি এড়িয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসাকে চিহ্নিত করে এবং এদরে বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়।
ভ্যাট কমিশনারেটগুলোর অনেক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, এসব কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বাইরে তাদের প্রাধিকার সীমিত থাকে। সাধারণত, নিজস্ব অঞ্চলের বাইরে তারা কোনো অভিাযান চালাতে পারে না। অথচ অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠানের কারখানা এক অঞ্চলের অন্তভর্‚ক্ত থাকলেও এদের কর্পোরেট বা ডাটা সেন্টার অন্য এলাকায় অবস্থিত। ফলে কেন্দ্রীয়ভাবে বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষিত হিসাব-পত্রে ফাংশনাল ভ্যাট অফিসের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এসব হিসাবের তথ্য ছাড়া কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করলে তা কখনো বস্তুনিষ্ঠ হয় না। তবে ভ্যাট গোয়েন্দার এখতিয়ার সারা দেশে হওয়ায় প্রয়োজনে যে কোনো সময় যে কোনো প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করা য়ায়। ফলে ভ্যাট গোয়েন্দার অভিযানে উদ্ঘাটন আরো বেশি তথ্যনির্ভর হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি বড় রেস্টুরেন্ট রাজধানীর বাইরে হাইওয়ের পাশে বেশ রমরমা ব্যবসা করেছে। স্থানীয় ভ্যাট অফিস ঐ রেস্টুরেন্টের ব্যবসা থেকে যা ভ্যাট পেয়েছে তার বাইরেও ঐ ব্যবসায়ী ভ্যাট সংগ্রহ করেছে। কিন্তু ঐ ব্যবসায়ীর হিসাব-পত্র ঢাকার নিকুঞ্জ এলাকার একটি বাড়িতে সংরক্ষণ করতো। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ভ্যাট বিভাগের ব্যবসায়ীর ঐ অফিসে প্রবেশাধিকার ছিল না। ভ্যাট গোয়েন্দা দীর্ঘদিন নজরদারি করার পর অভিযানে নামে। এতে দেখা যায়, তিন বছরে ঐ প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২০০ কোটি টাকার বিক্রয় তথ্য গোপন করে ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে কেবল ভ্যাট গোয়েন্দার ‘জুরিসডিকশনাল অ্যাকসেস’ এর কারণে। ভ্যাট গোয়েন্দা অনেক ক্ষেত্রে ভৌগোলিক বা ডিজিটাল সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে এমন অনেক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদপ্তর ভ্যাট আইানে তদন্তও সম্পন্ন করে। এনবিআরসহ বিভিন্ন দপ্তর কোন অভিযোগের প্রাথমিক তথ্য বা সত্যতা পেলে তা এই সংস্থাকে তদন্ত করার জন্য অনুরোধ করে। এসব তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করে তা আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেয়া হয়। এই অধিদপ্তর অন্য পাংশনাল ভ্যাট কমিশনারেট থেকে অধিকতর নিরপেক্ষ থেকে তদন্ত কাজটি সম্পন্ন করতে পারে। এর কারণ হলো, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান স্থানীয় ভ্যাট অফিসের তত্ত¡াবধানে কাজ করায় অনেক সময় পেশাদারিত্বের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ব্যবসায়ী বা ভোক্তারাও অনেক সময় হয়রানির অভিযোগ উত্থাপন করে থাকে। এসবের তদন্ত নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করার প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে, পেশাদারিত্বের বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদপ্তর গোয়েন্দা, তদন্ত ও নিরীক্ষা করার জন্যই সৃষ্ট। তাই এই সংস্থার নানা ধরনের প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার আলোকে কার্যক্রমে মুন্সিয়ানা গড়ে উঠেছে। এতে জটিল প্রকৃতির অভিযোগের সুষ্ট‚ তদন্ত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
অন্যদিকে, নিরীক্ষা কার্যক্রমে ভ্যাট গোয়েন্দা অধিক মনোযোগী। বছরের শুরু বা মাঝামাঝিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করে অডিটের জন্য কর্মসূচি দেয়া হয়। এবিষয়ে এনবিআরের বিশেষ গাইডলাইন রয়েছে। এই নির্দেশনা অনুসারে এমনভাবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হয় যেন তা ফাংশনাল ভ্যাট কমিশনারেটের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়। এসব অডিট করার সময় প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট সংক্রান্ত কাগজপত্রই শুধু দেখা হয় না; তাদের বাণিজ্যিক দলিলাদি, সিএ রিপোর্ট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সরেজমিনে যাচাই, অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের তথ্য ইত্যাদি বিষয়ও যাচাই করা হয়। তাই এসব অডিটে ৩৬০ ডিগ্রি যাচাই হয়ে যায়। কোনো প্রতিষ্ঠান ফাঁকির সাথে যুক্ত হলে তা অডিটের সময় উদঘাটিত হয়। ফলে অডিটে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির চিত্র উঠে আসে। এদরে একটি অংশ কোনো বিচারিক প্রক্রিয়ায় না গিয়ে স্বপ্রণোদিত ও স্বেচ্ছায় দাবিক্রত টাকা জমাও করে। অডিট করতে গিয়ে যদি দেকা য়ায়, প্রতিষ্ঠানটির গোপন হিসাব দাখিল করেনি, তাহলে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে তার অনুসন্ধান করা হয়। এত প্রয়োজনে বিভিন্ন প্রাঙ্গণে তল্লাশিও চালানো হয়। এমন তল্লাশির ঘটনা অনেক রয়েছে। প্রাথমিক অডিট প্রতিবেদনে উত্থাপিত আপত্তির টাকার চেয়ে চ‚ড়ান্ত প্রতিবেদনের টাকার পরিমাণ অনেক বেশি হয়েছে।
ভ্যাট গোয়েন্দার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা। নতুন ভ্যাট আইন (২০১২) বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে ২০১৯ এর ১লা জুলাই থেকে। এই আইন অনুসারে আইনের তৃতীয় তফসিলে উল্লেখিত পণ্য ও সেবা এবং বিশেষ এসআরও-তে উল্লেখিত পণ্য ও সেবা ব্যতিত সকল অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের উপর ভ্যাট প্রযোজ্য রয়েছে। আইন অনুযয়ী এসব প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূল্যক নিবন্ধন গ্রহণ, রিটার্ন দাখিল ও ট্রেজারি জমাসহ অন্যান্য দায়-দায়িত্ব পালন করতে হবে। বর্তমানে ভ্যাট অনলাইন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায় যে, দেশে মোট প্রায় ৩,৩০,০০০ নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু এখনো একটি বড় অঙশ নিবন্ধনের আওতায় আসেনি। এতে সার্বিকভাবে ভ্যাট এর ‘চেইন ইফেক্ট’ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই অবস্থার উত্তরণের জন্য ভ্যাট গোয়েন্দা মাঝেমধ্যে জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে কোনো শপিংমল বা এলাকায় ভ্রাট যোগ্য অথচ নিবন্ধন নেয়নি- এমন প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে সেগুলোকে আইনের আওতায় আনতে নানা ধরনের ব্যবস্থা যেমন, বাধ্যতামূলক নিবন্ধন প্রদান, মামলা দায়ের ইত্যাদি) নেয়া হয়। ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদপ্তর ২০২১ সালের মে মাসে এমন জরিপের আয়োজন করে। রাজধানী ও ঢাকার বাইরে এমন প্রতিষ্ঠান জরিপ করে দেখতে পায় যে, জরিপ সংশ্লিষ্ট শপিংমলের খুচরা ব্যবসায়ীদের প্রায় ৭৮% ভ্যাট নিবন্ধন নেয়নি। এই চিত্র প্রকাশের পর স্থানীয় ভ্যাট কমিশনারেটগুলো একই পদ্ধতিতে ঐসব প্রতিষ্ঠানে জরিপ করে ব্যাট এর আওতায় নিয়ে আসার তাগিদ সৃষ্টি হয়।
এসব ফাংশনাল কার্যক্রম ছাড়াও ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদপ্তর ভ্যাট আইন ও বিধিমালা প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোথাও কোনো বির্চুতি বা ঘাটতি দেখা দিলে তা এনবিআরের গোচরে নিয়ে আসে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ও বাস্তবসম্মত অবস্থান নেয়ার জন্য সুপারিশ করে। এতে রাজস্ব আহরণে নানা জটিলতা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তাছাড়া, কোনো হয়রানির অভিযোগ উত্তাপিত হলে তা সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেটের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। আইন-কানুনে কোনো অসঙ্গতি দেখা দিলে তা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিয়ে এনবিআরের নিকট তুলে ধরে ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদপ্তর।